প্রবাস

বিদেশে বৈধ হওয়ার সুযোগ হারালে কী করবেন?

বিদেশে কাজ করতে গিয়ে অনেক বাংলাদেশি কর্মী নানা কারণে বৈধ বসবাস বা কাজের অনুমতি হারান। কারও ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যায়, কেউ চাকরি পরিবর্তন করতে গিয়ে অনুমোদিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে পারেন না, আবার কেউ নিয়োগকর্তার অবহেলা বা প্রতারণার কারণে অবৈধ অবস্থায় পড়ে যান।

এমন পরিস্থিতিতে অনেকেই গ্রেপ্তার, জরিমানা বা দেশে ফেরত পাঠানোর ভয়ে আত্মগোপন করেন।

তবে বিদেশে বৈধ অবস্থান হারালেই সব পথ বন্ধ হয়ে যায় না। অনেক দেশে নির্দিষ্ট শর্তে ভিসার মেয়াদ বাড়ানো, নতুন নিয়োগকর্তার অধীনে কাজের অনুমতি নেওয়া, জরিমানা দিয়ে অবস্থান নিয়মিত করা কিংবা স্বেচ্ছায় দেশে ফেরার সুযোগ রয়েছে। এসব সুবিধা দেশভেদে আলাদা এবং নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কার্যকর হতে পারে।

তাই বিদেশে অবৈধ অবস্থায় পড়ে গেলে আতঙ্কিত না হয়ে সংশ্লিষ্ট দেশের আইন, অভিবাসন কর্তৃপক্ষ এবং বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করা জরুরি।

বিদেশে একজন বাংলাদেশি কর্মী বিভিন্ন কারণে বৈধ অবস্থান হারাতে পারেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য-

  • ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়া: নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ভিসা নবায়ন না করলে অবস্থান অবৈধ হতে পারে।
  • ওয়ার্ক পারমিট বাতিল: নিয়োগকর্তা চাকরি বাতিল করলে বা কাজের অনুমতি প্রত্যাহার করলে বৈধ অবস্থান ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
  • চাকরি পরিবর্তনে অনিয়ম: প্রয়োজনীয় অনুমতি ছাড়া এক প্রতিষ্ঠান থেকে অন্য প্রতিষ্ঠানে কাজ শুরু করলে অভিবাসন আইন লঙ্ঘিত হতে পারে।
  • নিয়োগকর্তার প্রতারণা: নিয়োগকর্তা সময়মতো ভিসা বা ওয়ার্ক পারমিট নবায়ন না করলে কর্মী বিপাকে পড়তে পারেন।
  • চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়া: চাকরির চুক্তি শেষ হওয়ার পর নির্ধারিত নিয়মে নতুন অনুমতি না নিলে বৈধতা হারানোর আশঙ্কা থাকে।
  • কাগজপত্রের জটিলতা: পাসপোর্ট, রেসিডেন্স পারমিট বা প্রয়োজনীয় নথি নবায়নে বিলম্ব হলেও সমস্যা তৈরি হতে পারে।

বিদেশে ভিসা বা কাজের অনুমতির মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে যত দ্রুত সম্ভব পরিস্থিতি যাচাই করা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে কয়েকটি পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ।

১. নিজের অভিবাসন অবস্থান যাচাই করুন

প্রথমে ভিসা, রেসিডেন্স পারমিট ও ওয়ার্ক পারমিটের মেয়াদ পরীক্ষা করুন। কোন তারিখ থেকে বৈধতা শেষ হয়েছে এবং কোনো নবায়ন বা আপিলের সুযোগ রয়েছে কি না, তা সংশ্লিষ্ট দেশের অভিবাসন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে নিশ্চিত হতে হবে।

২. নিয়োগকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করুন

নিয়োগকর্তার কারণে ভিসা বা ওয়ার্ক পারমিটের সমস্যা হলে লিখিতভাবে বিষয়টি জানান। চাকরির চুক্তি, বেতন পরিশোধের প্রমাণ এবং নিয়োগকর্তার সঙ্গে যোগাযোগের নথি সংরক্ষণ করুন।

৩. অভিবাসন আইনজীবীর পরামর্শ নিন

কোনো দেশে ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নবায়ন বা বৈধতা পুনরুদ্ধারের আবেদন করা যায়। আবার কোথাও জরিমানা, বিশেষ অনুমতি বা স্বেচ্ছায় প্রত্যাবর্তনের ব্যবস্থা রয়েছে। নিজের পরিস্থিতি অনুযায়ী আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া উচিত।

৪. বাংলাদেশ দূতাবাস বা কনস্যুলেটের সহায়তা নিন

নিকটস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রমকল্যাণ উইং বা কনস্যুলার শাখায় যোগাযোগ করুন। পাসপোর্ট হারিয়ে গেলে, নিয়োগকর্তা সহযোগিতা না করলে কিংবা দেশে ফিরতে প্রয়োজনীয় ভ্রমণ নথি না থাকলে দূতাবাসের সহায়তা চাওয়া যায়।

বিদেশে বৈধতা হারানোর পর পরিস্থিতি অনুযায়ী কয়েকটি আইনি পথ খোলা থাকতে পারে।

১. ভিসা বা রেসিডেন্স পারমিট নবায়ন

কিছু দেশে ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে জরিমানা দিয়ে নবায়নের আবেদন করা যায়। তবে মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার পর আবেদন গ্রহণ করা হবে কি না, তা সংশ্লিষ্ট দেশের অভিবাসন আইনের ওপর নির্ভর করে।

২. নতুন নিয়োগকর্তার অধীনে কাজের অনুমতি

কোনো কর্মী নিয়োগকর্তার সঙ্গে বিরোধ, চাকরি হারানো বা চুক্তি শেষ হওয়ার কারণে বৈধতা হারালে কিছু দেশে নতুন নিয়োগকর্তার অধীনে কাজের অনুমতি নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

উদাহরণ হিসেবে, সৌদি আরবের মানবসম্পদ ও সামাজিক উন্নয়ন মন্ত্রণালয় ২০২৫ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর থেকে নির্দিষ্ট শর্তে কর্মবিরতি বা অনুপস্থিতির কারণে অনিয়মিত অবস্থায় পড়া কিছু পেশাজীবী কর্মীর জন্য নতুন নিয়োগকর্তার কাছে বৈধভাবে স্থানান্তরের উদ্যোগ নেয়। এতে নির্দিষ্ট সময় সৌদিতে অবস্থান এবং নতুন নিয়োগকর্তার ফি পরিশোধের মতো শর্ত রয়েছে।

৩. সাধারণ ক্ষমা বা অ্যামনেস্টি কর্মসূচি

কিছু দেশ নির্দিষ্ট সময়ের জন্য অবৈধভাবে অবস্থানরত বিদেশিদের বৈধ হওয়ার অথবা জরিমানা কমিয়ে দেশে ফেরার সুযোগ দেয়। এসব কর্মসূচিকে সাধারণত অ্যামনেস্টি বা নিয়মিতকরণ কর্মসূচি বলা হয়।

তবে সব কর্মসূচিতে নতুন করে বৈধ হওয়ার সুযোগ থাকে না। কোনোটি শুধু জরিমানা কমিয়ে স্বেচ্ছায় দেশে ফেরার সুযোগ দেয়।

৪. স্বেচ্ছায় দেশে ফেরার সুযোগ

কোনো দেশে বৈধ হওয়ার আর কোনো পথ না থাকলে স্বেচ্ছায় দেশে ফেরার ব্যবস্থা বিবেচনা করা যেতে পারে। এতে কোনো কোনো ক্ষেত্রে শাস্তি বা জরিমানার পরিমাণ কম হতে পারে। তবে ভবিষ্যতে পুনরায় প্রবেশের নিষেধাজ্ঞা থাকবে কি না, তা আগে জেনে নেওয়া জরুরি।

সৌদি আরব ও মালয়েশিয়ায় কী ধরনের সুযোগ রয়েছে?

সৌদি আরব

সৌদি আরবে কর্মীদের বৈধতা পুনরুদ্ধারের জন্য নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে নিয়োগকর্তা পরিবর্তন ও কর্মসংস্থানসংক্রান্ত ব্যবস্থা রয়েছে। ২০২৫ সালে দেশটির মানবসম্পদ মন্ত্রণালয় Qiwa প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে নির্দিষ্ট শ্রেণির অনুপস্থিত কর্মীদের নতুন নিয়োগকর্তার অধীনে স্থানান্তরের উদ্যোগ নেয়।

আরও পড়ুনঃ বিদেশে যাওয়ার আগে মেডিকেলে আনফিট হতে পারেন যেসব কারণে!

এ ছাড়া ২০২৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত কিছু প্রতিষ্ঠানের জন্য মেয়াদোত্তীর্ণ বা ইস্যু না হওয়া ওয়ার্ক পারমিট নিয়মিত করার বিশেষ সময়সীমা বাড়ানোর তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। তবে এটি সব অনিয়মিত কর্মীর জন্য সাধারণ ক্ষমা নয়; নির্দিষ্ট নিয়োগকর্তা ও কর্মসংস্থানসংক্রান্ত শর্ত প্রযোজ্য।

সৌদি আরবে ভিসার মেয়াদ অতিক্রম করে অবস্থান করলে জরিমানা, কারাদণ্ড ও বহিষ্কারের ঝুঁকি রয়েছে। ২০২৬ সালের ১৩ জুলাই দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে সতর্ক করে জানায়, নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে জরিমানা ৫০ হাজার সৌদি রিয়াল পর্যন্ত এবং কারাদণ্ড ছয় মাস পর্যন্ত হতে পারে।

মালয়েশিয়া

মালয়েশিয়ায় অনিয়মিত অবস্থানে থাকা বিদেশিদের জন্য Migrant Repatriation Programme 2.0 নামে স্বেচ্ছায় দেশে ফেরার কর্মসূচি চালু করা হয়েছিল। এর আওতায় নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করে জরিমানা দিয়ে দেশে ফেরার সুযোগ দেওয়া হয়।

২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ হাইকমিশনও মালয়েশিয়ায় বৈধ কাগজপত্র ছাড়া অবস্থানরত বাংলাদেশিদের এ কর্মসূচির মাধ্যমে দেশে ফেরার বিষয়ে আহ্বান জানায়। তবে এই কর্মসূচি নতুন করে কাজের অনুমতি পাওয়ার সুযোগ নয়; এটি মূলত দেশে ফেরার প্রক্রিয়া।

সৌদি আরব ও মালয়েশিয়ার এসব ব্যবস্থা নির্দিষ্ট সময় ও শর্তের ওপর নির্ভরশীল। তাই আবেদন করার আগে সংশ্লিষ্ট দেশের ইমিগ্রেশন বিভাগের সর্বশেষ ঘোষণা যাচাই করতে হবে।

বিদেশে বৈধতা হারানো বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য সংশ্লিষ্ট দেশের বাংলাদেশ দূতাবাস বা কনস্যুলেটের শ্রমকল্যাণ উইং গুরুত্বপূর্ণ সহায়তার জায়গা।

দূতাবাসের মাধ্যমে যেসব বিষয়ে সহায়তা চাওয়া যেতে পারে-

  • নিজের পরিচয় ও নাগরিকত্ব যাচাই।
  • পাসপোর্ট হারিয়ে গেলে ট্রাভেল পারমিট বা প্রয়োজনীয় ভ্রমণ নথির বিষয়ে সহায়তা।
  • সংশ্লিষ্ট দেশের অভিবাসন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের নির্দেশনা।
  • দেশে ফেরার প্রক্রিয়া সম্পর্কে তথ্য ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা।
  • নিয়োগকর্তার নির্যাতন, বেতন আটকে রাখা বা প্রতারণার অভিযোগ জানানো।
  • স্থানীয় আইন অনুযায়ী বৈধতা পুনরুদ্ধার বা দেশে ফেরার কর্মসূচি সম্পর্কে তথ্য পাওয়া।
  • প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে বিভিন্ন দেশের বাংলাদেশ মিশনের শ্রমকল্যাণ উইংয়ের কর্মকর্তা, ফোন নম্বর ও ই-মেইল প্রকাশ করা রয়েছে।
  • প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়

ওয়েবসাইট: https://probashi.gov.bd/

বিদেশে বৈধতা হারানোর পর অনেক কর্মী ভয়ে আত্মগোপন করেন। কেউ কেউ দালালের মাধ্যমে ভুয়া ভিসা, জাল কাগজপত্র বা অবৈধভাবে কাজের চেষ্টা করেন। এসব সিদ্ধান্ত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করতে পারে।
বিশেষ করে-
1. জাল ভিসা বা ওয়ার্ক পারমিট তৈরি করবেন না।
2. দালালের কথায় কাউকে বড় অঙ্কের টাকা দেবেন না।
3. অন্যের পরিচয় বা পাসপোর্ট ব্যবহার করবেন না।
4. অভিবাসন কর্তৃপক্ষের নোটিশ বা সমন উপেক্ষা করবেন না।
5. বৈধতা পুনরুদ্ধারের সুযোগ আছে কি না যাচাই না করে দেশ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেবেন না।
6. কোনো কাগজে স্বাক্ষর করার আগে তার বিষয়বস্তু বুঝে নিন।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (ILO) নির্দেশনায় বলা হয়েছে, অনিয়মিত অভিবাসন অবস্থায় থাকা কর্মীদেরও মৌলিক মানবাধিকার ও শ্রম অধিকার রয়েছে।

তাই বৈধতার সমস্যা থাকলেও বকেয়া মজুরি, নির্যাতন বা শোষণের বিষয়ে প্রতিকার চাওয়ার সুযোগ একেবারে শেষ হয়ে যায় না।

  • যদি বৈধ হওয়ার কোনো সুযোগ না থাকে, তাহলে আইন মেনে দেশে ফেরার প্রস্তুতি নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে-পাসপোর্ট ও পরিচয়সংক্রান্ত কাগজপত্র প্রস্তুত রাখতে হবে।
  • সংশ্লিষ্ট দেশের ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে দেশে ফেরার নিয়ম জানতে হবে।জরিমানা বা অন্য কোনো আইনি দায় রয়েছে কি না যাচাই করতে হবে।
  • দেশে ফেরার আগে ভবিষ্যতে পুনরায় ওই দেশে প্রবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে কি না জানতে হবে।প্রয়োজন হলে বাংলাদেশ দূতাবাসের সহায়তা নিতে হবে।

বিদেশে বৈধতা হারানো মানেই একজন প্রবাসী কর্মীর সব সম্ভাবনা শেষ হয়ে যাওয়া নয়। তবে সমস্যাটি যত দীর্ঘায়িত হবে, আইনি জটিলতা ও আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকিও তত বাড়তে পারে।

তাই ভিসা বা ওয়ার্ক পারমিটের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া সবচেয়ে নিরাপদ। আর কোনো কারণে বৈধতা হারালে আত্মগোপন না করে সংশ্লিষ্ট দেশের অভিবাসন কর্তৃপক্ষ, বাংলাদেশ দূতাবাস এবং প্রয়োজনে অভিবাসন আইনজীবীর সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এক দেশের নিয়ম অন্য দেশে প্রযোজ্য নয়। তাই দালালের আশ্বাসে নয়, সরকারি নির্দেশনা ও নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতেই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।

সম্পর্কিত খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button